এতে বলা হয়েছে, নগরে উন্মুক্ত ড্রেনের কারণে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। গত ছয় বছরে অন্তত ১৪ জন—যাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু—এমন অনুরূপ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বরাবরই দায় এড়িয়ে চলেছে, নেয়নি কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
নোটিশদাতা আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আশরাফুর রহমান বলেন, শহরের নালাকে উন্ম্ক্তু না রেখে নিরাপদ করতে বলা হয়। অন্যথায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন করা হবে। ড্রেন ও খালজনিত দুর্ঘটনাগুলো একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, এটি একটি শাসনব্যবস্থা ও পৌরসেবা ব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে।
শিশু হুমায়রার মৃত্যু প্রশাসনিক গাফিলতিরই ফল, এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিবারকে শুধুই সান্ত্বনা নয়, বরং অবহেলার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক বার্তা। এক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ হয়তো হুমায়রার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু এমন নজিরমূলক পদক্ষেপ ভবিষ্যতের প্রশাসনিক দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলতে পারে। এরকম ঘটনা বারবার ঘটলেও প্রতিবার দায় এড়িয়ে গেলে নাগরিক সুরক্ষা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, বর্ষাকালে ড্রেনগুলো খোলা ছিল এবং কর্তৃপক্ষ কোনো রকম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়নি। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই একটি তিন বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মনে রাখতে হবে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারি কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব। হুমায়রার মৃত্যুতে তার পরিবার চরম ও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা অর্থ দিয়ে পূরণীয় নয়। তবে, পরিবারের প্রতি কিছুটা সান্ত্বনা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়।
এ ঘটনায় চসিকের প্রতিক্রিয়ায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, এটি “হীন উদ্দেশ্যে আত্মপ্রচারের” চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। তাঁর বক্তব্য, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে তা মূলত একটি বেসরকারি গার্মেন্টস কারখানার সীমানাভুক্ত ‘সার্ভিস ড্রেন’। সে হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষের।
সিটি কর্পোরেশন আইনের সীমারেখার মধ্যে নাগরিক সেবা প্রদান করে চলেছে এবং এই ঘটনা নিয়ে যেকোনো আইনগত কার্যক্রমে যথাযথ জবাব প্রদান করবে।
চসিকের জনসংযোগ দপ্তর থেকে বলা হয়, ড্রেনটি ছিল মাত্র ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের, যা সাধারণত উন্মুক্তই থাকে। উক্ত গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং একটি আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছিল।
শিশুটির মা ওই গার্মেন্টসে কাজ করেন। শিশুটির মা বা পরিবারও তাদের সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়ে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেনি যা দুঃখজনক ঘটনাটির জন্ম দিয়েছে।
জনসাধারণের প্রশ্ন হলো, সিটি কর্পোরেশন কি শুধুই নিজের সীমারেখা দেখিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে পারে? আইন ও নীতিগত দায়বদ্ধতা কখনো সিটি কর্পোরেশন এরিয়ে যেতে পারে না। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
ড্রেনের মালিকানা যারই হোক, সে যদি উন্মুক্ত থাকে এবং সে পথ দিয়ে শিশু পড়ে মারা যায়— তাহলে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ কতটা যুক্তিসংগত?
একটি শিশুর মৃত্যু প্রশাসনিক ব্যর্থতা, গার্মেন্টসের দায়িত্বহীনতা, কিংবা অভিভাবকের অসতর্কতার কারণে হোক—প্রতিটি দিকেই দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠে। কিন্তু প্রশাসনের দায়িত্ব উপেক্ষা করে নাগরিকের দোষে দৃষ্টি দিলে, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
হুমায়রার মৃত্যুর ঘটনায় যারা শোকাহত, তারা শুধু সন্তান হারায়নি—তারা হারিয়েছে নিরাপত্তার আস্থা, নাগরিক সেবার প্রতিশ্রুতি, আর রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের প্রত্যাশা।
