প্রতিবছর প্রায় চার হাজার পণ্যবাহী জাহাজ এই বন্দরে আসাুযাওয়া করে এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ৩৫ লাখ টিইইউ’এস ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে| ক্রমবর্ধমান এই বাণিজ্যিক চাপ সামাল দিতে এবং ভবিষ্যতের সামুদ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে জলসীমা সম্প্রসারণের নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ|
বিশ্ব বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এই সম্প্রসারণ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে| তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিরাপদ সমুদ্র ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ|
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে ৬২ নটিক্যাল মাইল জলসীমা বাড়িয়ে তা ৭২ নটিক্যাল মাইল করা হবে| এর ফলে উত্তর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল, দেশের বৃহত্তম শিপ রিসাইক্লিং শিল্পাঞ্চল, সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল সংলগ্ন সমুদ্র এলাকা বন্দরের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সেবার আওতায় চলে আসবে|
জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো চট্টগ্রাম বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রার সময় এর জলসীমা ছিল মাত্র ৬ নটিক্যাল মাইল| সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বন্দরের পরিধি কয়েক দফা বৃদ্ধি করা হয়েছে| ২০১১ সালে আলফা, ব্রেভো ও চার্লি অ্যাংকরেজকে কেন্দ্র করে বন্দরের জলসীমা সম্প্রসারণ করা হয়| পরবর্তীতে ২০১৯ সালে মাতারবাড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারণের মাধ্যমে বন্দরের জলসীমা ৬২ নটিক্যাল মাইলে উন্নীত হয়|
প্রায় সাত বছর পর আবারও নতুন করে পোর্ট লিমিট পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে| পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণে কক্সবাজারের মাতারবাড়ি থেকে উত্তরে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে বন্দরের সামুদ্রিক কার্যক্রম|
এতে বাড়বে রাজ¯^, বাড়বে বাণিজ্যিক সুবিধা| বর্তমানে বন্দরের জলসীমায় প্রবেশ বা অবস্থানকারী জাহাজ থেকে বিভিন্ন ধরনের মেরিন চার্জ, পোর্ট ডিউস ও অন্যান্য ফি আদায় করা হয়| শুধু এই খাত থেকেই বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি রাজ¯^ আয় করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ|
নতুন জলসীমার আওতায় সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প, মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানা এবং ভবিষ্যতের সামুদ্রিক লজিস্টিক কার্যক্রম যুক্ত হলে রাজ¯^ আয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে|
বিশেষজ্ঞদের মতে, মীরসরাইয়ে গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতোমধ্যে দেশিুবিদেশি শতাধিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে| এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথের ব্যবহার বাড়বে| ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারিত জলসীমা ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হবে|
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আলফা, ব্রেভো এবং চার্লি—এই তিনটি অ্যাংকরেজ রয়েছে| নতুন পরিকল্পনায় সন্দ্বীপ চ্যানেলকে কেন্দ্র করে ‘এস (সন্দ্বীপ) অ্যাংকরেজ’ নামে আরও একটি নতুন জাহাজ নোঙর এলাকা গড়ে তোলা হবে|
এর ফলে কর্ণফুলী নদীর মোহনা ও পতেঙ্গা এলাকায় অবস্থান করা বিপুল সংখ্যক লাইটারেজ জাহাজকে আরও নিরাপদ ও প্রশস্ত এলাকায় স্থানান্তর করা সম্ভব হবে| এতে নদীপথে জাহাজের চাপ কমবে এবং নৌ চলাচলের শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে|
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পতেঙ্গা উপকূলে নির্মাণাধীন বে টার্মিনাল এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সমš^য়| তাই ইতোমধ্যে বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ির সঙ্গে সমš^য়ের প্রস্তুতি চলছে| বে টার্মিনাল চালু হলে বর্তমানে কর্ণফুলী চ্যানেলের সীমাবদ্ধতার কারণে বন্দরে প্রবেশ করতে না পারা বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে|
অন্যদিকে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে| তাই এই তিনটি অবকাঠামোকে ঘিরে একটি সমšি^ত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে|
শিপইয়ার্ড মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, এই বিপুল সম্ভাবনাকে শতভাগ কাজে লাগাতে হলে এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিসহায়তা, শ্রমিকদের জন্য শতভাগ নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ| এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় ব্লু ইকোনমিই হয়ে উঠবে আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি|
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু জলসীমা বাড়ালেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না| সম্প্রসারিত এলাকায় নিয়মিত ড্রেজিং, আধুনিক বয়া স্থাপন, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ, রাডার নেটওয়ার্ক, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ নৌ চলাচলের অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে|
সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং অঞ্চল, সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং গভীর সমুদ্র এলাকায় জাহাজ চলাচল বাড়লে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়বে| এজন্য কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে| দ্রুতগতির টহল জাহাজ, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আকাশপথে নজরদারি ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে|
বিশ্লেষকদের মতে, ৭২ নটিক্যাল মাইল জলসীমা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর আর শুধু কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক একটি বন্দর হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না| এটি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল, সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প এবং মীরসরাই শিল্পনগরকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ সামুদ্রিক অর্থনৈতিক করিডরে রূপ নেবে| সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে নীল অর্থনীতির নতুন কেন্দ্রের|
