২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। একইসাথে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১ হাজার ২২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়। মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বাজেট হিসেবে তিনি চসিককে ঋণমুক্ত, স্বনির্ভর ও টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সোমবার (২৩ জুন) নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনে চসিক মেয়র এ বাজেট পেশ করেন।
চসিক মেয়র বলেন, ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের সময় চসিকের দেনার পরিমাণ ছিল ৫৯৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ডিএসএল বাবদ বকেয়া ছিল ১৪৬ কোটি টাকা। ধারাবাহিক দেনা পরিশোধের মাধ্যমে বর্তমানে মোট দেনা ৪০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এবার প্রথমবারের মতো পৌরকর বাবদ ১৪০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন সহায়তা বরাদ্দ খাতে ৬৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং বিশ্ব ব্যাংকের কোভিড-১৯ সহায়তা বাবদ প্রায় ৬০ কোটি টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। আয়কর বাবদ ৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, ভ্যাট বাবদ ৩৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনুতোষিক ও ভবিষ্যৎ তহবিল বাবদ যথাক্রমে ১৯ কোটি ১৮ লাখ ও ২৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। প্রতি মাসে ৪০০ জনকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে আনুতোষিক দেওয়া অব্যাহত রয়েছে।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চসিকের আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহন করা হলে রাজস্ব আয় বহুগুণে বাড়বে এবং চসিক আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। বর্তমানে চসিক এলাকায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৩টি হোল্ডিং ও ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৩৪টি ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। কর ও লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা অনলাইনে আনা হয়েছে এবং ৮টি রিভিউ বোর্ডের মাধ্যমে গণশুনানি পরিচালিত হচ্ছে। জাইকার সহায়তায় আধুনিক বাজেট ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে অটোমেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করছি, আগামী অর্থবছরের মধ্যে পুরো হিসাব বিভাগ অটোমেশনের আওতায় চলে আসবে।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে আধুনিকায়ন আনার কারণে ১৯টি খাল থেকে ৪১ লাখ ঘনফুট মাটি ও আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, ড্রেনেজ পরিষ্কারে ১৪৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, বর্ষায় আরও ২০০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মশক নিধনে আধুনিক পদ্ধতি ও আমেরিকান প্রযুক্তির লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগ্রাবাদ বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের দায়িত্ব নৌবাহিনীকে দিয়ে ২ কোটি ২০ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। চলতি মৌসুমে অতি বৃষ্টিতেও জিইসি, বহদ্দারহাট, চকবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো তলিয়ে যায়নি।
আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণে দক্ষিণ পাহাড়তলীতে ১০ একর জমি কেনা হয়েছে এবং কুলগাঁও এলাকায় বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ কাজও এগিয়ে চলছে। চসিক প্রতিষ্ঠিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরায় চসিকের অধীনে আনা হয়েছে এবং ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া চসিকের প্রসারমান কার্যক্রমের জন্য পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো অনুমোদনের আবেদন স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ‘সিটিজেন চার্টার’ প্রণয়ন করে তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে নাগরিক সেবার ধরন ও সময়সীমা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে চসিক সচিব মো. আশরাফুল আমিনের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির চৌধুরী।
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারায় বলা আছে– ‘কর্পোরেশনের মেয়াদ হবে কর্পোরেশন গঠিত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর’। এদিকে চসিকের বর্তমান (ষষ্ঠ) পরিষদের প্রথম সভা হয়েছে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ওই হিসেবে এ পর্ষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। যদি মেয়রের মেয়াদ না বাড়ে তাহলে এই ঘোষিত বাজেটই হবে ডা. শাহাদাত এর প্রথম ও শেষ বাজেট।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় চসিকের ষষ্ঠ পরিষদের নির্বাচন। এ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। নির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ডা. শাহাদাত। তিনি ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পান। তবে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৮ ভোট দোখিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন রেজাউল করিম।
গত বছরের জুনে চসিকের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন তিনি; যেটি ছিল ষষ্ঠ পরিষদের চতুর্থ বাজেট। ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ডা. শাহাদাত ৯ জনকে বিবাদী করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক খাইরুল আমিন ডা. শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণা করে এ মামলার রায় দেন। রেজাউল করিম চৌধুরীর মেয়র নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করেন। পাশাপাশি ১০ দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবকে নির্দেশ দেন।
এরপর ৮ অক্টোবর ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। সর্বশেষ একই বছরের ৩ নভেম্বর শপথ বাক্য পাঠ করেন তিনি। ৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
