মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

বাংলাদেশ নয় বছরের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হবে

চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে অনুমোদন পাওয়া ছয়টি বৃহৎ প্রকল্পকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশা ˆতরি হয়েছে|

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
বাংলাদেশ নয় বছরের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হবে

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, শিল্পাঞ্চল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সম্ভাব্য একাধিক বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামোকে সমš^য় করা গেলে এই অঞ্চল দেশের অর্থনৈতিক করিডর ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে| আগামী বাংলাদেশ নয় বছরের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হবে|

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো নিজ শহর চট্টগ্রাম সফরে এসে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন| শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চট্টগ্রাম চে¤^ার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নের্তৃবৃন্দের উপস্থিতিতে তিনি এসব কথা বলেন|

চট্টগ্রাম চে¤^ার সভাপতি আমিরুল হক অর্থমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের সহায়ক অবকাঠামো, চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডের পতেঙ্গা-সাগরিকা অংশ, চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন রেলপথ, কক্সবাজারের রামুর রশিদনগরে ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক—এই ছয় প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ পরিবেশে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে|

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শুধু দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবেই নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবেও বিকশিত হতে পারে| আনোয়ারার শিল্পাঞ্চল ও সম্ভাব্য ফ্রি ট্রেড জোনকে ঘিরে অবকাঠামো উন্নয়ন হলে নতুন কারখানা, গুদাম, কনটেইনার ডিপো, সরবরাহসেবা এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ বাড়বে| অর্থমন্ত্রীও আনোয়ারায় প্রায় ৬০০ একর জমিতে একটি ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন| একই সঙ্গে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি, সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পণ্য পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করার পথ সহজ হবে|

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যোগাযোগ অবকাঠামোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে| পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত সিটি আউটার রিং রোড উন্নয়ন নগরীর বন্দরাঞ্চল, বিমানবন্দর, শিল্প এলাকা ও প্রধান সড়কগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনকে দ্রুততর করতে পারে| অন্যদিকে আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, টইটং, পেকুয়া, বদরখালী হয়ে চকরিয়া পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন হলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অর্থনীতি নতুন সংযোগ পাবে| পর্যটন, মৎস্য, লবণ, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক বন্দর অর্থনীতির সঙ্গে এই সড়ক যোগাযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে|

রেল যোগাযোগেও বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা ˆতরি হয়েছে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্পকে ঘিরে| অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে লাকসাম অংশের উন্নয়নের মাধ্যমে ট্রেনে যাতায়াতের সময় প্রায় দুই ঘণ্টা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা বাজেটে রাখা হয়েছে| রেলপথে সময় কমলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি কনটেইনার ও শিল্পপণ্য পরিবহনেও নতুন সম্ভাবনা ˆতরি হবে| সড়কনির্ভর পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ কমিয়ে রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহন বাড়ানো গেলে বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন উৎপাদন ও ভোগকেন্দ্রের সংযোগও শক্তিশালী হবে|

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে কার্গো ও প্যাসেঞ্জার হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে| সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, রেল ও সড়কপথকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারলে দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য, ˆতরি পোশাক, ওষুধ, হালকা প্রকৌশলপণ্য এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রামের সক্ষমতা বাড়বে| বন্দরনির্ভর শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে এই বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমার সম্ভাবনাও রয়েছে|

ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, প্রকল্প অনুমোদনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাস্তবায়নের গতি, মান এবং সমš^য়| একই অঞ্চলে সড়ক, রেল, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প আলাদা আলাদাভাবে বাস্তবায়িত হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে| এজন্য জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, অর্থায়ন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বন্দর-শিল্পাঞ্চল সংযোগের ক্ষেত্রে সমšি^ত পরিকল্পনা প্রয়োজন|

চট্টগ্রাম চে¤^ারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী কাজ করছেন| তাঁর উপস্থাপিত বাজেট দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা| বাজেটে কর-সুবিধা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে প্রণোদনার ঘোষণাও ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে|

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নয় বছর তথা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে| এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে| তাঁর ভাষ্য, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া আর্থিক দায়, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে সরকার একটি চ্যালেঞ্জিং বাজেট প্রণয়ন করেছে| আগে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে; এরপর সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ বছর থেকে সমৃদ্ধির ধারা আরও দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন|

চট্টগ্রামের জন্য ঘোষিত ছয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন তাই শুধু স্থানীয় উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত| প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, ¯^চ্ছতার সঙ্গে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি নতুন গতি পাবে| আর শিল্পাঞ্চল, সড়ক, রেল, বিমানবন্দর ও গভীর সমুদ্রবন্দরকে এক সুতোয় গাঁথা গেলে চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থেই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডর ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে|

এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, এখন থেকে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয়তা, অগ্রাধিকার, কার্যকারিতা এবং পরিবেশগত বিবেচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে| ব্যক্তি¯^ার্থ বা দুর্নীতিনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে যেসব উদ্যোগে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে, সেসব প্রকল্পেই বিনিয়োগ করা হবে|

এই বক্তব্যের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চট্টগ্রামের বড় প্রকল্পগুলোর সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও জড়িত| উপকূলীয় সড়ক, শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও নগর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় জলাবদ্ধতা, পাহাড়, খাল, নদী, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনবসতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে| প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনজীবনের ক্ষতি কমানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের সুফল প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে|

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডেঙ্গু ব্লক উদ্বোধন করে অর্থমন্ত্রী ¯^াস্থ্যখাতের উন্নয়ন নিয়েও সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন| তিনি বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ানো বা নতুন ভবন নির্মাণ করলেই ¯^াস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়; প্রয়োজন ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা| প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক ¯^াস্থ্যসেবা জোরদার করতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান| তাঁর মতে, প্রতিরোধমূলক ¯^াস্থ্যসেবা কার্যকর হলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমবে|

সম্পর্কিত বিষয়

  • বাংলাদেশ
  • ট্রিলিয়ন ডলার
  • অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন