১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার পর কেটে গেছে ৬৩ বছর| এই দীর্ঘ সময়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিস্তৃত হলেও উপকূলীয় পতেঙ্গার ৩৯, ৪০ ও ৪১ ন¤^র ওয়ার্ডের বাসিন্দারা পাইপলাইনের মাধ্যমে ওয়াসার পানি পাননি| অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে| কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পতেঙ্গায় ওয়াসার পরিশোধিত পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা| এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের সফলতা নয়, বরং কয়েক লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা|
লবণাক্ত পানি আর পানির জন্য যুদ্ধ-
পতেঙ্গা উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এখানকার ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অনেক বেশি| অধিকাংশ টিউবওয়েলের পানি পানযোগ্য নয়| ফলে বছরের পর বছর ধরে নিরাপদ পানির জন্য স্থানীয়দের নির্ভর করতে হয়েছে বিকল্প উৎসের ওপর|
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় ইপিজেড থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত এলাকায় অন্তত ৪০টি দোকানে ওয়াসার পানি বিক্রি হতো| শহরের অন্য এলাকা থেকে আনা পানি বড় বড় রিজার্ভারে সংরক্ষণ করে পরে ড্রামে ভরে ভ্যানযোগে বিভিন্ন মহল্লায় সরবরাহ করা হতো| ২৫ লিটারের একেকটি ড্রাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে| বহু পরিবার মাসে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করেও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পেত না|
বয়স্ক বাসিন্দাদের মতে, পতেঙ্গার মানুষের কাছে সুপেয় পানি ছিল এক ধরনের বিলাসিতা| বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করত| অনেক পরিবারকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো|
চাহিদা ১০ কোটি লিটার, সরবরাহ মাত্র ৪ কোটি -
চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, পতেঙ্গা এলাকায় বর্তমানে ˆদনিক পানির চাহিদা প্রায় ১০ কোটি লিটার| অথচ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৪ কোটি লিটার| ফলে প্রতিদিনই প্রায় ৬ কোটি লিটার পানির ঘাটতি থেকে যাচ্ছে| অন্যদিকে বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ˆদনিক ৬ কোটি লিটার| বর্তমানে এই প্রকল্পের পানি আনোয়ারা, কর্ণফুলী, পটিয়া ও বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে|
ওয়াসার নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভাণ্ডালজুড়ি প্রকল্প থেকে প্রতিদিন অন্তত ২ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্টের মাধ্যমে পতেঙ্গায় সরবরাহ করা হবে| এতে দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই কমে আসবে|
সাত বছরের জটিলতা কাটলো তিন দিনে -
চট্টগ্রাম ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, কর্ণফুলী টানেল ব্যবহারের মাধ্যমে পতেঙ্গায় পানি সরবরাহের বিষয়টি নতুন নয়| তবে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে প্রায় সাত বছর ধরে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি| গত ১ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম| দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন| তিন দিনের মাথায়, ৩ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়| এ নিয়ে ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথ অনেকটাই সুগম হয়েছে|
ছয় মাসের মধ্যে পানি পৌঁছানোর আশা -
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম জানিয়েছেন, পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসন হয়েছে| প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই পতেঙ্গার তিনটি ওয়ার্ডে ওয়াসার পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে| এ লক্ষ্যে পুরোনো ও জরাজীর্ণ লাইন সংস্কার, নতুন সংযোগ স্থাপন এবং বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে|
জন¯^াস্থ্য ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব -
জন¯^াস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা ও অন্যান্য ¯^াস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে| ফলে নিরাপদ ও পরিশোধিত পানির সরবরাহ নিশ্চিত হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ¯^াস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে| অন্যদিকে পরিবারগুলোকে আর উচ্চমূল্যে পানি কিনতে হবে না| এতে তাদের মাসিক ব্যয় কমবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে| শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত পতেঙ্গার আবাসিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে|
নতুন সম্ভাবনার দ্বার -
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্টকে ব্যবহার করে পানি সরবরাহের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে| তাদের মতে, পতেঙ্গার তিনটি ওয়ার্ডে পানি পৌঁছানো শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার অবসানের প্রতীক| ৬৩ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে উপকূলের মানুষের ঘরে ঘরে যখন ওয়াসার পানি পৌঁছাবে, তখন সেটি হবে চট্টগ্রামের নগর সেবার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক|
