মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও জন্মভূমি ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল প্রতীক। তাই তাঁর স্মৃতিবেদীতে লেখা আছে - ‘এদেশ আমার স্বদেশ আমার উত্তরাধিকার মৃত্যু মেনে মৃত্যু জেনে রাখব অধিকার’
১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নূতন চন্দ্র সিংহ। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই স্বশিক্ষিত মানুষ পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়, যা একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। নারীশিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কুণ্ডেশ্বরী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালিকা বিদ্যামন্দির এবং ১৯৬৯ সালে বালিকা মহাবিদ্যালয়। তাঁর উদ্যোগে অসংখ্য মেয়েশিশু শিক্ষার সুযোগ পায় এবং সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করে।
এছাড়া দরিদ্র মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে বিনামূল্যে পারাপারের ব্যবস্থা, বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দানসহ অসংখ্য মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কুণ্ডেশ্বরী কমপ্লেক্স ছিল মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক-কর্মকর্তাও সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সকলের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি দেশ ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
১৩ এপ্রিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে কুণ্ডেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মমভাবে নিহত হন নূতন চন্দ্র সিংহ। তাঁর হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নৃশংস অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মানবতার সেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নূতন চন্দ্র সিংহকে ২০১১ সালে (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন ও নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের অবদান ও ত্যাগ চট্টগ্রামসহ সমগ্র জাতির জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
