বিশেষ করে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবকাঠামো ও জনসংখ্যার ঘনত্ব যত বেশি, ক্ষতির মাত্রাও তত গুরুতর হয়। দক্ষিণ এশিয়া ভৌগোলিকভাবে এমন একটি অঞ্চল, যেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সর্বদা বিরাজমান।
ভারতীয় উপমহাদেশের টেকটোনিক প্লেট, হিমালয় পর্বতশ্রেণীর ক্রমাগত উত্থান এবং মিয়ানমার ও আন্দামান অঞ্চলের ভূ-গঠনের কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলো বারবার ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকি থেকে বাদ যায় না। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যার চাপের কারণে বাংলাদেশের জন্য ভূমিকম্প একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে তিন দিক থেকে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে—উত্তরে হিমালয় অঞ্চল, পূর্বে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমার, এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরীয় সাবডাকশন জোন। এ তিনটি অঞ্চলই ভূমিকম্প উৎপাদনের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্প বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কম্পনই কাঁপিয়ে দিচ্ছে শহরের ভবন, মানুষের মন এবং রাষ্ট্রের প্রস্তুতির বাস্তবতা। সেক্ষেত্রে ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে ঘটলে তা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগই হবে না, বরং মানবিক, অবকাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেই জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
গেল বছর ২১ নভেম্বর ছিল শুক্রবার, সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে উত্তর-পূর্বে নরসিংদী এলাকা। এর পরের দিন অর্থাৎ ২২ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে আবার ৩ দশমিক ৩ মাত্রার একটি মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। একই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৭ এবং মাত্র এক মিনিট পর সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার আরেকটি কম্পন রেকর্ড করা হয়।
অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে চারবার ভূমিকম্প হয়েছে। এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ। ঢাকার অন্তত ১৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গেল ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ দিনের মধ্যেই দেশে অন্তত দশবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—এগুলো কি বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? কিংবা পরবর্তী বড় ভূমিকম্পের আগে আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত?
সর্বশেষ শুক্রবার ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস ও ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের তথ্যমতে, এর উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা।
এর আগের দিন ভারতের সিকিম অঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া ৪ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পও বাংলাদেশে অনুভূত হয়। তারও আগে মিয়ানমার উৎপত্তিস্থল থেকে সৃষ্ট কম্পন ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়েছে। একই মাসের শুরুতে সিলেট, সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট এলাকায়ও একাধিক ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।
এগুলোকে অনেকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করতে পারেন। কিন্তু ভূকম্পবিদদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম জটিল ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের অংশ।
বাংলাদেশ মূলত তিনটি বড় ভূতাত্ত্বিক সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান করছে—মধুপুর ফল্ট, দাউকি ফল্ট এবং আরাকান সাবডাকশন জোন। এসব ফল্টলাইনে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমে রয়েছে। যখন এই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়, তখনই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে ৮ বা তারও বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি জমে আছে। ইতিহাসও সেই আশঙ্কাকে অস্বীকার করে না। ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার বড় উদাহরণ।
কিন্তু অতীতের সেই ভূমিকম্পের সময় বাংলাদেশের শহরগুলো এত ঘনবসতিপূর্ণ ছিল না। আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ঢাকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। কোটি কোটি মানুষ বসবাস করছে এমন এক নগরে, যেখানে অনেক ভবনই যথাযথ প্রকৌশল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি।
দেশে জাতীয় বিল্ডিং কোড থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। অনুমোদিত নকশা ছাড়াই ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং প্রকৌশল তদারকির অভাব—এসব সমস্যা এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ হতে পারে।
ঢাকা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি চট্টগ্রামও বড় ধরনের বিপদের মধ্যে রয়েছে। বরং বিশেষজ্ঞের মতে, চট্টগ্রাম কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যাহা জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।কারণ বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, কন্টেইনার টার্মিনাল, জ্বালানি ডিপো, গুদামঘর এবং আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ বাণিজ্যিক নগরী চ্ট্টগ্রাম শহরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়।
অর্থাৎ চট্টগ্রামে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তা শুধু প্রাণহানিই ঘটাবে না, দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা। চট্টগ্রামের বড় অংশ পাহাড়ি এলাকা, আবার অনেক জায়গা ভরাট করা জমির ওপর নির্মিত। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন ভূমিকম্পের সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শহরের বহু এলাকায় রাস্তা সরু, খোলা জায়গা সীমিত এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। বড় কোনো ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ভূমিকম্পের সময় মানুষের আচরণও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক কয়েকটি কম্পনের সময় দেখা গেছে—অনেকেই আতঙ্কে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছেন। কেউ কেউ লিফট ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন, যা আরও বিপজ্জনক।
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ভূমিকম্প মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। কিন্তু আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত অনেক সময় প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটি নিরাপত্তা পদ্ধতি হলো “ড্রপ–কভার–হোল্ড অন”। অর্থাৎ কম্পন শুরু হলে নিচু হয়ে বসতে হবে, শক্ত টেবিল বা আসবাবের নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং মাথা ও ঘাড় সুরক্ষিত রাখতে হবে। কাঁচের জানালা, ভারী আলমারি কিংবা ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকা জরুরি।
কিন্তু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও নগর পরিকল্পনার বড় ধরনের পরিবর্তন।
প্রথমত, জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনগুলো চিহ্নিত করে কাঠামোগত পরীক্ষা ও রেট্রোফিটিং করতে হবে।
তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় খোলা জায়গা ও জরুরি আশ্রয়স্থল বাড়াতে হবে। বড় কোনো দুর্যোগে মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনেক এলাকায় স্পষ্ট নয়।
চতুর্থত, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা প্রয়োজন। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, কারখানা—সব জায়গায় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে আতঙ্ক কমবে এবং দুর্ঘটনাও কমবে।
প্রকৃতি কখন কোথায় আঘাত হানবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়া মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
ভূমিকম্প থামানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক নগর পরিকল্পনা, কঠোর বিল্ডিং কোড এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়।
