মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার চট্টগ্রামে বেকারত্বের কষাঘাত

অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার খ্যাত চট্টগ্রাম—যেখানে দেশের বাণিজ্যের প্রবাহ ও কর্মসংস্থানের প্রাণকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল—সেই শহরেই এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার চট্টগ্রামে বেকারত্বের কষাঘাত

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অনেক চাকরিজীবীদের স্থায়ী আবাস গড়ে তুললেও সরকারি নীতির কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীই ভুগছে আঞ্চলিক কর্মসংস্থানের সংকটে। তবে শিক্ষার মান ও চাকরির বাজারের চাহিদার সমন্বয়হীনতায় উচ্চশিক্ষা এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ এর তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম বিভাগে বেকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৪ হাজারে। জেলার জনসংখ্যা ৯১ লাখ ৬৯ হাজার ৪৬৫ জন, যার মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি—অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নন।

এক দশক আগেও চট্টগ্রামে পোশাক খাতে শ্রমিক সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৯ লাখে। চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ-৩ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ-সংশ্লিষ্ট ৫৮০টি পোশাক কারখানার মধ্যে চালু আছে ৫২৮টি, আর গত এক বছরে কার্যাদেশ না থাকায় বন্ধ হয়েছে ৫২টির বেশি কারখানা।

ফার্মাসিউটিক্যাল খাতেও একই অবস্থা বিরাজমান। গত তিন দশকে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের (জিএসকে) মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিসহ ৩০টির বেশি ওষুধ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন চালু রয়েছে মাত্র ৮ থেকে ১০টি কারখানা। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চার হাজারের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন এবং ২৫০ কোটির বিনিয়োগ হাতছাড়া হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেসরকারি ব্যাংক খাত থেকেও বড় ধাক্কা এসেছে। শুধু পটিয়াতেই ৭ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন।

বিনিয়োগের টানাপোড়েন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, যা কর্মসংস্থান তৈরি করে ১২ হাজার ৮৫৮ জনের জন্য। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রস্তাব কমে যায় প্রায় ২০ শতাংশ। পরের বছর সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও কমে ৮.৮০ শতাংশ।

মৎস্য রপ্তানি খাতেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একসময় আধিপত্য থাকলেও এখন ৫৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ২৪টি। এছাড়া গত এক দশকে চট্টগ্রামে অন্তত এক হাজার জুতার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

বর্তমানে চট্টগ্রামের যুবসমাজে হতাশা চরম আকার ধারণ করেছে। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৫-২৪ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে ৩০.৩৮ শতাংশ (৫ লাখ ৮৮ হাজার ৩১০ জন) শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কোনো কাজে যুক্ত নেই।

জেলায় বেকারের সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি, চট্টগ্রাম সিটি এলাকায় ১ লাখের বেশি। মোট যুব বেকার প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর জানাচ্ছে, আইটি, সেলাই ও কৃষি খাতে সরকারি প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও যুবকদের একটি বড় অংশ আগ্রহী নন। অন্যদিকে, বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যাওয়া অনেকেই ফের দেশে ফিরে আসছেন। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রবাসীদের মধ্যে ৩৬.৩৬ শতাংশ স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসেছেন—অর্থাৎ প্রতি তিনজনের একজন।

চট্টগ্রামে গত ১০ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১.০৬ শতাংশে। নারীর সাক্ষরতা ৭৯.২৬ শতাংশ, পুরুষের ৮২.৮৮ শতাংশ। কিন্তু শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার মান ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। উচ্চশিক্ষা এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, চট্টগ্রামে বেকারত্ব বাড়ার মূল তিন কারণ হলো- চাকরির বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয়হীনতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা এবং বিনিয়োগে ভাটা পড়া ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুঁজির ঘাটতি।

তাদের মতে, আঞ্চলিক কর্মসংস্থানের গুরুত্ব না দিয়ে বহিরাগত চাকরিজীবীদের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় যুবকরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) এর কর্মকর্তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেন, গ্যাস সংকট ও ব্যবহারিক উপাদান (ইউটিলিটিস) সমস্যা, চট্টগ্রামে অনেক শিল্পই গ্যাসের যথেষ্ট যোগান পাচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস সংযোগ ঘাটতির কারণে নতুন সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক অর্ডার বাতিল হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও শক্তি সঙ্কটও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলছে। পরিকাঠামো বা ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ও পরিবহন বাধা, বন্দর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু অবকাঠামো সম্প্রসারণ পিছিয়ে আছে। বন্দর লেনদেন, পোর্টের প্রসারিত টার্মিনালের অভাব ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। রেলপথে বিলম্ব ও অব্যবস্থাপনায় কনটেনার পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, আর তা হচ্ছে রেল অবকাঠামোর সমস্যার কারণে।

জাতীয় বাজেট প্রাক আলোচনায় সিসিসিআই “বাজেটবান্ধব ও শিল্প-বান্ধব পরিবেশ” গঠনের জন্য ব্যবস্থা চায়। বিশেষ করে কর ব্যবস্থা (টেক্স সিস্টেম) সংস্কার ও অটোমেশন বাড়ানোর দাবি ব্যবসায়ীদের।

আয়কর হ্রাস, অ্যাডভান্স ইনকামটেক্স রিফান্ড দ্রুত করা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করার জন্য নজরদারি বাড়ানোর মত প্রস্তাব করা হয়েছে। সিসিসিআই নিজে উদ্যোগ নিয়েছে একটি স্পেশাল ইকোনমিক জোন নির্মাণের, যেখানে ক্ষুদ্র-মধ্যম উদ্যোগ ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য প্লট দেওয়া হবে, কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ট্যাক্স নেট বাড়ানো হোক, তবে সাধারণ করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না বাড়িয়ে। ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের প্রতি গুণগত সেবা ও অবকাঠামোগত প্রতিক্রিয়াশীলতা বাড়ানোর দরকার রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সড়ক, বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা।

সরকার গৃহীত নীতিমালা ও প্রোগ্রামগুলি শ্রমবাজার, যুবসমাজ ও বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণে কাজের প্রতি গুরুত্ব বাড়াতে হবে-

২০২৫-২৬ বাজেটে ১৯টি শ্রমবাজার প্রোগ্রামের জন্য প্রায় ৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই প্রোগ্রামগুলোতে উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রযুক্তি এবং নারীদের সময়োপযোগী ব্যবহারের জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রোগ্রাম যুব এবং কর্মহীনদের জন্য উন্নত সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে।

স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি) উদ্যোগ গ্রামীণ ও শহুরে যুবদের কাজের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে সহায়তা করছে। ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিং প্রোগ্রাম, বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য ট্রেনিং, ড্রাইভিং ট্রেনিং ইত্যাদি।

শ্রমবাজার প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো হয়েছে – যেমন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রশিক্ষণ, ঋণ, সম্পদের উদ্দীপনা দান করা হচ্ছে।

সরকারি খাতে ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ বা সমপর্যায়ের কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ গত ১০০ দিনে প্রায় ৮৬ হাজার ২৭৭ জন কিছু কিছু সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত খাতে কাজ পেয়েছেন।

সম্পর্কিত বিষয়

  • অর্থনীতি
  • স্বর্ণদ্বার
  • চট্টগ্রাম
  • কর্মসংস্থান
  • আঞ্চলিক
  • বিবিএস

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন