১১টি সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত দীর্ঘ তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আদালতে উপস্থাপনের মতো প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। শিগগিরই দেওয়ানি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রাথমিকভাবে মামলার আওতায় আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, জেমকন, নাসা, বসুন্ধরা, সিকদার ও আরামিট গ্রুপকে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কার্যক্রমের পাশাপাশি তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, যৌথ তদন্ত দল নিবিড় অনুসন্ধানের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
১১ সংস্থার সমন্বিত তদন্ত
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেয় বিএফআইইউ। তদন্তে অংশ নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কাস্টমস গোয়েন্দাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। পুরো প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা দিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।
তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তদন্তের সব তথ্য কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে সংরক্ষণের শর্তও আরোপ করা হয়েছিল।
গত বছরের ২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিএফআইইউকে পাঠানো এক চিঠিতে যৌথ তদন্তের সিদ্ধান্ত জানায়। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি তদন্তের কাঠামো, নেতৃত্ব ও কার্যপদ্ধতি চূড়ান্ত করা হয়।
যেসব অভিযোগে তদন্ত
বিএফআইইউর পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়, সংশ্লিষ্ট গ্রুপ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা অর্জন, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া বিদেশে পাচার করা সম্পদ শনাক্ত ও তা দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স ও বিএফআইইউকে জানাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিদেশে অনুসন্ধান, জব্দ ব্যাংক হিসাব
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্তাধীন বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থের অবস্থান শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
তদন্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণের ব্যবহার, অর্থের গতিপথ, বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থ ফেরাতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, সেসব ব্যাংককে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। তবে ধারাবাহিক আইনি উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ধাপে ধাপে অর্থ পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি। ফলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলো বিচারাধীন বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
