গত ৩১ আগস্ট মঞ্চে দাঁড়িয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ঘোষণা দিলেন—“চীনা জাতি কোনো স্বৈরশাসককেই ভয় করে না, বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন অনিবার্য।” তার ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট, বার্তাটি ওয়াশিংটনের উদ্দেশেই।
প্রেসিডেন্ট সি দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ও জাপানের বিরুদ্ধে প্রধান ভূমিকা ছিল চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের। এভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বাধীন ইতিহাসের বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেন। পাল্টা জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “চীনের মুক্তির পেছনে ছিল মার্কিন সৈন্যদের রক্তত্যাগ।” এই বাকযুদ্ধ দেখায়, বেইজিং-ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব এখন ইতিহাসের ব্যাখ্যায়ও বিস্তৃত হয়েছে।
বহুমেরুর বার্তা -
সামরিক কুচকাওয়াজের আগে তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ বৈঠকে সি চিন পিং, পুতিন ও মোদি একসঙ্গে হাত মেলান। তাদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়—বিশ্ব আর এক মেরুর নয়, বরং বহুমেরুর পথে এগোচ্ছে। চীন-ভারতের পুরোনো বৈরিতা এখন মার্কিন বাণিজ্য শুল্কের চাপের মুখে প্রশমিত, আর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধে জড়িত। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট সি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা এমন বিশ্ব চাই, যেখানে এক পরাশক্তির আধিপত্য নয়, বরং নিয়মনির্ভর বহুমেরুর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।”
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: ডলারের বিকল্প-
চীন তিয়ানজিন সম্মেলনে প্রস্তাব করে ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’, যার অধীনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বিকল্প একটি উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের ঘোষণা আসে। প্রাথমিকভাবে দুই বিলিয়ন ইউয়ান দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সি। মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য ভাঙা। রাশিয়া ও ইরান এই উদ্যোগকে জোরালো সমর্থন দিয়েছে।
ডলারের বিকল্প চালুর হুমকি নিয়ে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো এ পথে এগোলে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। কিন্তু তিয়ানজিন বৈঠক দেখায়, কেউই সেই হুমকি পাত্তা দিচ্ছে না।
ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত
সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক শক্তি হিসেবে উঠে আসে। কিন্তু আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধ, সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দা—এই সবকিছুই আমেরিকার প্রভাব ক্ষয় করেছে। বিপরীতে, চীন অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। এরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এসসিও (২০০১) এবং ব্রিকস (২০০৯)। নব্বইয়ের দশকে রুশ কূটনীতিক ইয়েভগেনি প্রিমাকভ যে ‘ত্রইকা’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আজ তার বাস্তবায়ন ঘটছে নতুন আঙ্গিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের নেতৃত্বে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে উঠবে না। তবে এসসিও ও ব্রিকসের সক্রিয়তা প্রমাণ করছে, একক আমেরিকান আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও একতরফা বাণিজ্যযুদ্ধ বরং প্রতিপক্ষদের একজোট হতে সাহায্য করছে।
