দুই দিনের অচলাবস্থার পর চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। শুল্কায়নের কাজ শুরু হওয়ায় প্রাইভেট আইসিডি থেকে বন্দরে রপ্তানি পণ্য আসা শুরু করেছে। বাড়ছে কনটেইনার ডেলিভারির গতি, পুরোদমে চলছে জাহাজে কনটেইনার তোলা। রবিবার পর্যন্ত ৪২ হাজার টিইইউ’স আমদানি কনটেইনার জমা রয়েছে। ১৪ হাজার ৩৭১ টিইইউ’স রপ্তানি কনটেইনার বেসরকারি ডিপোতে জমে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কর্মসূচির কারণে কেবল ব্যবসায়ীরা নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষ বিপাকে পড়েছে। কারণ গতকাল সোমবার ছিল চলতি অর্থবছরের শেষদিন। চলমান কর্মসূচির কারণে অনেক ব্যবসায়ীর রপ্তানি পণ্য বন্দরে আটকে গেছে। তারা ডেলিভারির ডকুমেন্টস যদি ব্যাংকে দিতে না পারে, ব্যাংক তো টাকা দেবে না। এছাড়া যাদের বড় ঋণ রয়েছে তারা সেটেলমেন্ট করতে হিমশিম খেতে হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার সাইদুল ইসলাম জানান, গত রবিবার রাতে 'শাটডাউন' কর্মসূচি প্রত্যাহার হওয়ায় গতকাল সকালের প্রথম প্রহর থেকেই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু হয়েছে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা বিল অব অ্যান্ট্রি ও বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল শুরু করেছেন। দুই দিনের অচলাবস্থায় ১৪ হাজার ৩৭১ টিইইউ’স রপ্তানি কনটেইনার ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে জমে যায়। একইসঙ্গে সৃষ্টি হয় ৩ হাজার ৬০০ ট্রাক-কার্ভাডভ্যানের দীর্ঘজট। গত রবিবার শিডিউল থাকা তিনটি জাহাজ ৩ হাজার ৬৮০ কনটেইনার নিতে না পারায় বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। গতকাল সোমবার দুপুরে ওই তিনটি জাহাজসহ পাঁচটি জাহাজ বন্দর ছাড়ার কথা রয়েছে। রপ্তানিকারকরা জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন এসব কনটেইনার জাহাজে তোলার।
জানা যায়, শাটডাউন কর্মসূচির কারণে চট্টগ্রামের ১৯টি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) থেকে বন্দরে কোনো রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার যায়নি। এ কারণে রবিবার বন্দর থেকে তিনটি জাহাজ ছেড়ে যেতে পারেনি। এর মধ্যে ‘হং ডা জিন-৬৮’ নামের জাহাজটিতে ১ হাজার ৬৬৬ একক কনটেইনার নিয়ে বন্দর ছাড়ার কথা ছিল। একইভাবে ‘এক্সপ্রেস নিলওয়ালা’ নামে আরেকটি জাহাজে রপ্তানির কথা ছিল ১ হাজার ৪৬০ একক কনটেইনার। ‘এএস সিসিলিয়া’ নামের অন্য জাহাজটিতে ৫৬৪ একক কনটেইনার নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার কথা। সেখান থেকে এসব কনটেইনার ইউরোপ-আমেরিকাগামী বড় জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাস্টমসের কর্মসূচির কারণে শনি ও রবিবার কোনো কনটেইনার ডিপো থেকে বন্দরে পাঠানো যায়নি। রপ্তানি কনটেইনার না পাওয়ায় তিন জাহাজই এখন জেটিতে অলস বসে আছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের শাটডাউন কর্মসূচি চলমান থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে গত দুদিনে ৬ হাজার আমদানি কনটেইনার জমা পড়েছে। একই সময়ে বেসরকারি অফডকগুলোতে জমা পড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার রপ্তানি কনটেইনার। শুল্কায়ন বন্ধ থাকায় কার্যত জনশূন্য হয়ে গেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্দরের জেটিগুলো। রপ্তানি কনটেইনারের অভাবে বন্দর থেকে ছেড়ে যেতে পারেনি তিনটি বিদেশি জাহাজ। রবিবার পর্যন্ত ৪২ হাজার আমদানি কনটেইনার জমা রয়েছে। কারণ শনিবার ১৩৭ কনটেইনার ডেলিভারি হলেও রবিবার ডেলিভারি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গত দুদিনে অন্তত ৬ হাজার ডেলিভারি কনটেইনার জমা পড়েছে। অফডক ডিপোগুলোতে আটকা পড়েছে সাড়ে ৭ হাজার রপ্তানি কনটেইনার।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এনবিআরের চলমান অচলাবস্থা রাজস্ব আদায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনবিআর হলো দেশের সবচেয়ে বড় শুল্ক-কর আদায়কারী সংস্থা হিসেবে বাজেটের ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এনবিআরকে দেয়া ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এ ধরনের স্থবিরতা বড় হুমকি। আবার বন্দরে রপ্তানি পণ্যের যে জট তৈরি হয়েছে তাতে করে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে হিমিশিম খেতে হবে আমাদেরকে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘কাস্টমস কর্মকর্তাদের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির কারণে রবিবার পর্যন্ত ৪২ হাজার আমদানি কনটেইনার জমা রয়েছে। এর মধ্যে শনিবার ১৩৭ কনটেইনার ডেলিভারি হলেও রবিবার ডেলিভারি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গত দুদিনে অন্তত ৬ হাজার ডেলিভারি কনটেইনার জমা পড়েছে। অফডক ডিপোগুলোতে আটকা পড়েছে সাড়ে ৭ হাজার রপ্তানি কনটেইনার।
ডিপো মালিকদের সংগঠন বিএফএফএ’র মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, গত শনিবার ও রবিবার শুল্কায়ন বন্ধ থাকায় কনটেইনার জমে যায়। গতকালও ৩ হাজার ৬০০ গাড়ি বাইরে অপেক্ষমাণ রয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে। খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কাঁচামালের অভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে জিম্মি করে এ ধরনের কর্মসূচি পালন আমরা অতীতে কখনো দেখিনি। গত দেড় মাস থেকে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কখনো আংশিক, কখনো পুরো কর্মসূচি পালন কোনোভাবেই কাম্য নয়।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল জানান, সৃষ্ট এই জট স্বাভাবিক হতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০ কনটেইনার বন্দরে ঢোকে। পুরনো কনটেইনার তুলতে গেলে নতুন কনটেইনারেও বিলম্ব হবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানির শুল্কায়ন থেকে খালাস পর্যন্ত সব কার্যক্রম কাস্টমসের অনুমোদনে হয়। বেশ কয়েকটি ধাপে কাস্টমসের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের শাটডাউন কর্মসূচির কারণে বন্দরের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের হস্তক্ষেপে সংকট সাময়িকভাবে কাটলেও ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ সময় লাগবে। জাহাজগুলো অপেক্ষা না করলে রপ্তানি আদেশ বাতিল বা ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া সোমবার হচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষদিন। চলমান কর্মসূচির কারণে অনেক ব্যবসায়ীর রপ্তানি পণ্য বন্দরে আটকে গেছে। তারা ডেলিভারির ডকুমেন্টস যদি ব্যাংকে দিতে না পারে, ব্যাংক তো টাকা দেবে না। এছাড়া যাদের বড় ঋণ রয়েছে তারা সেটেলমেন্ট করতে হিমশিম খেতে হবে।
উল্লেখ্য, এনবিআরে সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে গত ১২ মের পর থেকে আন্দোলন করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে সরকারের হয়ে রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাটিতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে বিঘ্ন ঘটেছে সেবায়, ভোগান্তিও বেড়েছে ব্যবসায়ীদের। এমন অবস্থায় শীর্ষ ১৩টি ব্যবসায়ী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতারা গত দুদিন সরকারের উচ্চ মহলে যোগাযোগ করে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি প্রত্যাহারে বাধ্য করে। তবে রবিবার পর্যন্ত বন্দরের জেটিতে ভেড়ানো ছিল ১০টি কনটেইনার জাহাজ। অন্যদিকে অপেক্ষায় ছিল আরো ২১টি কনটেইনার জাহাজ। অথচ এনবিআরের শাটডাউন কর্মসূচির আগে এ সংখ্যা ছিল ১৩টি।
