মূল সংবাদে যান
অপরাধ

পানিবন্দী নগরীর চরম ভোগান্তিতে জনজীবন

সৌরভ দীপ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীতে মৌসুমি বায়ুর তাণ্ডবে সোমবার (২৮ জুলাই) সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হয়। আর এই বৃষ্টিতে আক্ষরিক অর্থেই তলিয়ে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার বর্ষণে নগরের নিম্ন এলাকাগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
পানিবন্দী নগরীর চরম ভোগান্তিতে জনজীবন

রাস্তাঘাট পরিণত হয়েছে খালে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে বের হওয়া হাজারো মানুষ। শুধু রাস্তাই নয়, পানি ঢুকে পড়েছে নগরের ঐতিহ্যবাহী রেয়াজুদ্দিন বাজারের শত শত দোকানপাটেও।

jolj.jpg

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মাহমুদুল হাসান জানান, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। আমবাগান আবহাওয়া কেন্দ্রেও এই পরিমাণ ছিল ৫৫ মিলিমিটার। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ উপকূল অতিক্রম করলেও এর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। সঙ্গে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সারাদিনই মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) থেকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশা দিয়েছেন তিনি। ততক্ষণ পর্যন্ত, চট্টগ্রামের মানুষকে এই পানিযন্ত্রণা নিয়েই দিন কাটাতে হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভারি বর্ষণের ফলে নগরের চেনা দৃশ্যপট মুহূর্তেই বদলে যায়। জামালখানের শরীফ কলোনীসহ নিম্ন এলাকার সকল বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি উঠেছে। প্রবর্তক মোড়, জিইসি মোড়, ওয়াসা, চকবাজার, মুরাদপুর, বাদুরতলা, বড়গ্যারেজ, সিরাজদৌল্লাহ রোড, দুই নম্বর গেট, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ এবং রেয়াজুদ্দিন বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাঁটুপানি জমে যায়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, যানবাহন চলাচলের জন্য তৈরি আখতারুজ্জামান উড়ালসড়কেও পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হতে দেখা গেছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় হাটহাজারী সড়কে হাঁটুপানি ঠেলে যানবাহনগুলোকে কচ্ছপ গতিতে চলতে দেখা যায়, যা সৃষ্টি করে দীর্ঘ যানজট।

জলাবদ্ধতার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে নগরের প্রধান পাইকারি বাজার রেয়াজুদ্দিন বাজারে। সকাল ১০টার দিকে দেখা যায়, বাজারের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে কাপড়ের গলির দোকানগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। ‘এস আলম এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দোকানের মালিককে অসহায়ভাবে দোকানের ভেতর থেকে পানি সেঁচে মালামাল বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, বৃষ্টির কারণে রাস্তায় যানবাহন কমে যাওয়ায় গণপরিবহন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এই সুযোগে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকেরা হাঁকিয়েছেন দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া। ফলে বৃষ্টিতে ভেজা আর জলাবদ্ধতার ভোগান্তির পাশাপাশি যাত্রীদের গুনতে হয়েছে বাড়তি টাকা।

চট্টগ্রাম কলেজ এলাকার এক অভিভাবক বলেন, ‘মেয়েকে নিয়ে সিএনজিতে চড়েছি। সিএনজিচালক সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া চেয়েছেন। বাধ্য হয়ে দিয়েছি।’

চকবাজার এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘পরীক্ষা দিতে বের হয়েছি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। রাস্তায় নামতেই দেখি পানি থই থই করছে। রিকশা পাচ্ছি না, আর পেলেও দ্বিগুণ ভাড়া চাচ্ছে।’

সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা মুগ্ধ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছাতা নিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু গাড়ি থেকে নামতেই এত বৃষ্টি পেলাম যে পুরো কাপড় ভিজে একাকার। এই ভারি বৃষ্টি তো ছাতা মানছে না! এই ভেজা পোশাকেই পরীক্ষা দিতে হবে।’

শিক্ষানবিশ আইনজীবী মোহাম্মদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘চট্টগ্রামের সিরাজ-উদ-দৌলা রোডে সাব-এরিয়া এলাকায় রাস্তায় হাঁটু পরিমাণ পানি, দীর্ঘ দুই কিলোমিটার যানজট। যারা প্রাইভেট জব করেন, তাদের জন্য পানি পার হয়ে অফিস যাওয়া মানেই একদিনের বেতন কাটা পড়ার শঙ্কা।’

পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘মেহেদীবাগে সকাল থেকেই হাঁটু পানি জমে আছে। ধীরে ধীরে পানি আরও বাড়ছে, ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা বলেন, “খাল ও নালাগুলো পরিষ্কার আছে। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হওয়ায় পানি নামতে সময় লাগছে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে ১৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। কাজ শেষ হলে স্থায়ী সমাধান আসবে।”

ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে মো. শরীফ নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, “চট্টগ্রামের সিরাজ-উদ-দৌলা রোডে সাবেরিয়া এলাকায় রাস্তায় হাঁটু পরিমাণ পানি। দীর্ঘ ২ কিলোমিটার যানজট। ...যারা বেসরকারি জব করেন, পানিসহ ছবি তোলেন। নতুবা লেট অ্যাটেনডেন্সের জন্য একদিনের স্যালারি কেটে রাখবে!” তাঁর এই একটি কথাই যেন পুরো নগরবাসীর ভোগান্তির প্রতিচ্ছবি।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সবগুলো সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং জনগণকে সচেতন আচরণ করতে হবে। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম মহানগরীতে ভারীবর্ষন চলাকালে বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চকবাজার, কাতালগঞ্জ, জিইসি, পাঁচলাইশ, ওয়াসা, বাকলিয়া ও লালখানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন মেয়র। এসময় জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

পরিদর্শনকালে মেয়র স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও ভোগান্তির কথা শুনে বলেন, “জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই কাতালগঞ্জ রোডের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের নির্দেশ দিয়েছি অবিলম্বে ড্রেনেজ সিস্টেম সংস্কার করে পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করতে হবে। শুধু সাময়িক নয়, আমরা স্থায়ী সমাধানের দিকেই এগোচ্ছি। নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে চসিক সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পরিদর্শনকালে তিনি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে লিফলেট বিতরণ করেন এবং মাইকিং কার্যক্রম তদারকি করেন। পরিদর্শনের অংশ হিসেবে বাটালি পাহাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী তিনটি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। মেয়র জানান, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। একই সঙ্গে জনসাধারণকে সচেতন করতে নিয়মিত প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

বিল্ডিং কোড না মেনে স্থাপনা নির্মাণ নগরীর জলাবদ্ধতা অন্যতম কারণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমি সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখেছি বেশ কিছু ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোডগুলো তারা মানেনি। এ বিষয়ে আমি সিডিএ’র সাথে কথা বলব এবং তাদেরকে বলব বিল্ডিং কোড না মেনে নালা দখল করে গড়া স্থাপনাগুলো ভাঙতে। ভেঙ্গে কমপ্লিটলি যাতে ময়লাগুলো ক্লিন করা যায়। এটা আমাদের করতে হবে। কারণ প্রাইমারি ড্রেনেজ সিস্টেম নালালাগুলো আমাদের ক্লিন রাখতে হবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • পানিবন্দী
  • জলাবদ্ধতা
  • চসিক
  • সিডিএ

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন