বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড তৈরি পোশাক শিল্প। প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের তিন-চতুর্থাংশ আসে এই খাত থেকে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান এতদিন ধরে অনেকটা ‘শুল্কমুক্ত’ প্রবেশাধিকারের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের নতুন বাস্তবতায় এখন তৈরি পোশাক খাত এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার। ২০২৫ সালে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানি: প্রায় ৮.৭ বিলিয়ন ডলার, শুধু ২০২৩ সালেই বাংলাদেশ সেখানকার বাজারে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। তবে বাংলাদেশ জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি)’র আওতায় নেই—২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর তা প্রত্যাহার করা হয়। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে থাকে। এ হার ভিয়েতনাম বা মেক্সিকোর চেয়ে অনেক বেশি। আবার, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) না থাকায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার মাঠও ক্রমে অসম হয়ে পড়ছে।
এদিকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ঘিরে আরও কড়া নজরদারি শুরু করেছে রাজনৈতিক অধিকার ও শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে। ২০২৪ সালের শেষদিকে কিছু কংগ্রেসনাল হিয়ারিং এবং মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশে শ্রম অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একাধিক আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনও এই ইস্যুতে সরব। এ অবস্থায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ওয়াশিংটন হয়তো আবারও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, যা তৈরি পোশাক খাতের জন্য ভয়াবহ ধাক্কা হতে পারে।
এ অবস্থায় রপ্তানিকারকদের দুশ্চিন্তা ক্রমেই বাড়ছে। কারণ যদি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হার আরও বাড়ে বা কিছু নির্দিষ্ট কারখানার পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আসে, তাহলে অর্ডার চলে যেতে পারে প্রতিযোগী দেশ যেমন ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া বা কেম্বোডিয়ায়। ফলে কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে। এই খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার তাগিদ দিয়েছে।
বাংলাদেশকে এখনই প্রোঅ্যাকটিভ কূটনীতিতে মনোযোগ দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শ্রম অধিকার, কারখানা নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তর সংক্রান্ত সংলাপ জোরালো করতে হবে। সেই সঙ্গে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল বা অন্তত শুল্ক হার পুনর্বিবেচনার জন্য দৃঢ় কূটনৈতিক ও লবিং প্রচেষ্টা চালাতে হবে। একইসঙ্গে পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি কাঠামো, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে—যা আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
প্রায় এক দশক ধরে জিএসপি ফিরে পাওয়ার দাবিতে বাংলাদেশ সরকার, বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যুক্তরাষ্ট্রে লবিং চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ওয়াশিংটন ও ঢাকায় একাধিকবার ট্রেড অ্যান্ড ইনভেষ্টমেন্ট কোঅপারেশান ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট (টিআইসিএফএ)’র সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক কাঠামো নিয়ে আলোচনা উত্থাপন করা হয়। এতে আলোচনায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও উভয়পক্ষ ভবিষ্যতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি অফিস (ইউএসটিআর) এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের বক্তব্যে এখনো শুল্ক ছাড়ে আগ্রহের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে “লেবার কমপ্লায়েন্স” ও “গভর্ন্যান্স” ইস্যু। বিশেষ করে শ্রম অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, সাংবাদিক-নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্র পরিষ্কারভাবে বলছে—‘ট্যারিফ একসেস’ নয়, ‘টোটাল প্রসেস অ্যাকাউন্টাবিলিটি’ চায় তারা।
তাহলে কি আলোচনার দরজা খোলা, কিন্তু পথ বন্ধুর? বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শুল্ক ও বাজার প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও তা এখনো আশাব্যঞ্জক চুক্তিতে পৌঁছায়নি। তবে দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক স্বার্থ ও চাপ সামলানোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করছে এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই আলোচনার গতি ও গভীরতার ওপর।
সর্বশেষ কথা হলো, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন এক সন্ধিক্ষণে। শুধু উৎপাদন খরচ কম রাখাই যথেষ্ট নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে কৌশলগতভাবে কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে। মার্কিন শুল্কনীতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এ কথাটি বুঝে আগামী পদক্ষেপ নিতে না পারলে, বাংলাদেশের পোশাক খাত এক অদৃশ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে।
